মন্দা দামের মাঝে বৃষ্টি আঘাত, দিশাহারা আলুচাষিরা

এমনিতেই দামে ধস, তার ওপর বৃষ্টি। এ যেন মরার ওপর খাঁড়ার ঘা। রংপুরে হঠাৎ ঝড়ো হাওয়া ও ভার বৃষ্টিপাতে আলুক্ষেতের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। বৃষ্টির পানিতে ক্ষেত তলিয়ে যাওয়ায় নতুন করে তৈরি হয়েছে আলুতে পচন ধরার তীব্র শঙ্কা। আলুর দরপতনের হাহাকারের মাঝেই প্রাকৃতিক দুর্যোগে দিশাহারা হয়ে পড়েছেন কৃষকরা।

সরেজমিনে রংপুরের গঙ্গাচড়া, কাউনিয়া ও পীরগাছা উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, বিস্তীর্ণ আলুক্ষেত পানিতে তলিয়ে গেছে। ফসল বাঁচাতে ক্ষেত থেকে পানি সরানোর আপ্রাণ চেষ্টা করছেন কৃষকরা।

গঙ্গাচড়া উপজেলার বেতগাড়ি ইউনিয়নের কৃষক মিজানুর রহমান বলেন, ‘১২ বিঘা জমিতে আলুর আবাদ করেছি, ফলনও ভালো হইছে। কিন্তু এমনিতেই দাম কম। তার ওপর হঠাৎ করে ঝড়-বৃষ্টিতে আলুর অনেক ক্ষতি হয়ে গেলো।’

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বাজারে আলুর দাম নেই বললেই চলে। কেজি মাত্র ৮ থেকে ১০ টাকা। এখন বৃষ্টির কারণে কেজিপ্রতি আরও দাম কমে যাবে। এ অবস্থায় মরার ওপর খাঁড়ার ঘা হয়ে গেছে এই আলু।

আলুচাষি সরোয়ার হোসেন বলেন, ‘সারের সংকট ও দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। ধারদেনা করে আলু চাষ করে এখন বিপাকে আছি। বাজারে দাম নেই। কোল্ড স্টোরে রাখতে হলে বাড়িত টাকা গুণতে হচ্ছে। না হয় কালোবাজারি ও সিন্ডিকেট ব্যবসায়ীদের কাছে অল্প দামে আলু বিক্রি করতে হবে। এ কারণে ক্ষেতের মধ্যেই আলু রেখেছিলাম। দাম ভালো মিললে বিক্রি করবো কিন্তু হঠাৎ বৃষ্টিতে সব শেষ হয়ে গেলো।

তিনি বলেন, শুধু তার নয়, গ্রামাঞ্চলের বেশির ভাগ আলুচাষি এই অকাল বৃষ্টিতে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। একদিকে বাজারে আলুর দাম নেই অন্যদিকে এমন ঝড়-বৃষ্টিতে চাষিরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলেও তিনি জানান।

কাউনিয়া উপজেলার কয়েকজন কৃষক জানান, গত বছর আলুচাষ করে তাদের অনেকেই লোকসানের মুখে পড়েছেন। এবার ফলন ভালো হলেও বৃষ্টিতে হতাশ তারা।

কৃষক মোহাম্মদ আরিফ জানান, তার মোট জমিতে ২৫ লক্ষ টাকা বিনিয়োগ করেছেন। কিন্তু একদিকে বাজারে আলুর দাম কম, অন্যদিকে সিন্ডিকেট। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে বৃষ্টি। এ পরিস্থিতিতে গতবছরের মতো এবারো আলুতে লোকসানের আশঙ্কা করছেন তিনি।

কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, রংপুর বিভাগের আট জেলায় এবার প্রায় ২ লাখ ২৫ হাজার ৯৮৫ হেক্টর জমিতে আলুর চাষ হয়েছে। মোট উৎপাদন হয়েছে প্রায় ৫৬ লাখ ৬৮ হাজার ৯৯২ টন।

এর মধ্যে রংপুর জেলায় আলু উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৫৪ হাজার ৫০ হেক্টর। গত বছর ছিল ৬৬ হাজার ২৮০ হেক্টর। যা গত বছরের তুলনায় উৎপাদন কমেছে ১৩ হাজার হেক্টর।

রংপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের অতিরিক্ত পরিচালক সিরাজুল ইসলাম বলেন, বিভাগে রেকর্ড পরিমাণ জমিতে আলুর আবাদ করা হয়েছে। হঠাৎ বৃষ্টিতে আলুর ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে এবং পচে নষ্ট হওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। ক্ষেত থেকে পানি সরিয়ে যেকোনোভাবে আলু রক্ষার জন্য চাষিদের আমরা পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ ক্ষেতমজুর ও কৃষক সংগঠনের রংপুর জেলা আহ্বায়ক আনোয়ার হোসেন বাবলু বলেন, দেশজুড়ে বোরো আবাদের জন্য প্রয়োজনীয় সারের সংকট ও দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু আলুর দাম নেই। আলু বিক্রি করে কৃষক সার-তেল কিনবে তার উপায় নেই। আলু আমাদের প্রধান সবজি ও অর্থকরী ফসল। বিশ্বব্যাপী আলুর চাহিদা ব্যাপক। অথচ দেশের বাজারে আলুচাষিরা ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না। এমন সময় প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে আলু নিয়ে চাষিরা আরও বেশি চিন্তিত।

তিনি আরও বলেন, সরকারের উচিত হবে আলুর লাভজনক দাম নিশ্চিত করাসহ দুর্নীতি ও কালোবাজারি বন্ধ করে ভর্তুকি মূল্যে প্রান্তিক পর্যায়ে কৃষকের সার পাওয়ার নিশ্চয়তা করা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *